দেওয়ানী মামলা (Civil Suit) সাধারণত দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908) অনুসারে পরিচালিত হয়। মামলার প্রকৃতি ভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি সাধারণ দেওয়ানি মামলার ধাপগুলো নিম্নরূপ:
দেওয়ানী মামলার পর্যায়ক্রমিক ধাপ
মামলা (Plaint) দায়ের
বাদী আদালতে আরজি (Plaint) দাখিল করেন।
প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি ও সংশ্লিষ্ট নথি সংযুক্ত করা হয়।
আর্জি গ্রহণ ও নিবন্ধন
আদালত আরজি পরীক্ষা করে মামলা রেজিস্টার করেন।
ত্রুটি থাকলে সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারেন।
সমন জারি
বিবাদীর নিকট সমন জারি করা হয়।
প্রয়োজনে পুনরায় সমন, ডাক সমন বা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সমন জারি হতে পারে।
বিবাদীর হাজিরা
বিবাদী আদালতে উপস্থিত হন অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা দেন।
লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিল
বিবাদী বাদীর দাবির জবাব লিখিতভাবে দাখিল করেন।
ইস্যু (Issues) নির্ধারণ
কোন কোন বিষয়ে পক্ষদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে তা আদালত নির্ধারণ করেন।
দলিল দাখিল ও গ্রহণ
উভয় পক্ষ তাদের প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র আদালতে দাখিল করেন।
সাক্ষ্য গ্রহণ
প্রথমে বাদীপক্ষের সাক্ষ্য।
এরপর বিবাদীপক্ষের সাক্ষ্য।
জেরা (Cross-examination)
প্রতিপক্ষের আইনজীবী সাক্ষীদের জেরা করেন।
প্রয়োজনে স্থানীয় তদন্ত/কমিশন
প্রয়োজন হলে আদালত কমিশনার নিয়োগ বা স্থানীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন।
যুক্তিতর্ক (Argument)
উভয় পক্ষ মৌখিক ও লিখিত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
রায় (Judgment)
আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন।
ডিক্রি (Decree) প্রস্তুত
রায়ের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক ডিক্রি প্রস্তুত করা হয়।
আপিল (যদি প্রযোজ্য হয়)
সংক্ষুব্ধ পক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করতে পারেন।
ডিক্রি জারি (Execution Case)
ডিক্রি স্বেচ্ছায় পালন না করলে ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য এক্সিকিউশন মামলা দায়ের করা হয়।
সংক্ষিপ্ত ফ্লোচার্ট
মামলা দায়ের → সমন জারি → হাজিরা → লিখিত জবাব → ইস্যু নির্ধারণ → সাক্ষ্য → জেরা → যুক্তিতর্ক → রায় → ডিক্রি → আপিল (প্রযোজ্য হলে) → ডিক্রি জারি (Execution)
যেসব কারনে দেওয়ানী মামলা দীর্ঘায়িত হয়
দেওয়ানী মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে অনেক বাস্তব ও আইনগত কারণ রয়েছে। আদালত, পক্ষগণ, আইনজীবী এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন কারণে একটি মামলা বছরের পর বছর চলতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো—
দেওয়ানী মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ
সমন জারিতে বিলম্ব
বিবাদীকে সমন যথাসময়ে জারি না হওয়া।
সমন ফেরত আসা বা ঠিকানা ভুল থাকা।
একাধিকবার সমন জারি করতে হওয়া।
পক্ষগণের সময় প্রার্থনা (Adjournment)
বাদী বা বিবাদীপক্ষ বারবার সময় প্রার্থনা করলে মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
লিখিত জবাব দাখিলে বিলম্ব
বিবাদীপক্ষ নির্ধারিত সময়ে লিখিত জবাব দাখিল না করলে।
দলিল সংগ্রহ ও দাখিলে বিলম্ব
রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস বা অন্যান্য দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে সময় লাগা।
সাক্ষীর অনুপস্থিতি
সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না হওয়া বা বারবার অনুপস্থিত থাকা।
জেরা (Cross-examination) দীর্ঘ হওয়া
একাধিক সাক্ষী বা জটিল বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জেরা চলা।
কমিশন বা স্থানীয় তদন্ত
কমিশনার নিয়োগ, জরিপ, পরিমাপ বা তদন্ত সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগা।
অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন (Interlocutory Applications)
অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, পক্ষ সংযোজন, দলিল গ্রহণ, সংশোধনী আবেদনসহ বিভিন্ন আবেদনের নিষ্পত্তিতে সময় ব্যয় হওয়া।
উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ (Stay Order)
উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে মূল মামলার কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
বিচারকের বদলি বা আদালত পরিবর্তন
বিচারক বদলি, নতুন আদালতে স্থানান্তর বা এখতিয়ার পরিবর্তনের কারণে বিলম্ব হতে পারে।
মামলার অতিরিক্ত চাপ
আদালতে মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় দ্রুত শুনানির সুযোগ কমে যায়।
পক্ষগণের অসহযোগিতা
ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা, আদালতের নির্দেশ না মানা বা প্রয়োজনীয় নথি গোপন করা।
আপিল, রিভিশন বা অন্যান্য প্রতিকার
অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন করলে মূল মামলার গতি কমে যেতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিশেষ পরিস্থিতি
বন্যা, মহামারি, দীর্ঘ আদালত বন্ধ বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি।
আইনজীবীর ব্যস্ততা বা পরিবর্তন
আইনজীবী পরিবর্তন, প্রস্তুতির জন্য সময় চাওয়া বা অন্য কারণে শুনানি পিছিয়ে যাওয়া।
পক্ষগনের মৃত্যু
তাছাড়া মামলা চলাকালে পক্ষগনের মৃত্যু জনিত কারণ ও তারফলে তদবিরের জন্য মামলা দীর্ঘায়িত হয়।
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য করণীয়
সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানায় সমন জারির ব্যবস্থা করা।
অপ্রয়োজনীয় সময় প্রার্থনা এড়িয়ে চলা।
প্রয়োজনীয় দলিল ও সাক্ষী আগেই প্রস্তুত রাখা।
আদালতের নির্দেশ যথাসময়ে পালন করা।
অপ্রয়োজনীয় অন্তর্বর্তী আবেদন পরিহার করা।
প্রয়োজনে দ্রুত শুনানির (Early Hearing) আবেদন করা।
উল্লেখ্য: বাংলাদেশের আদালতগুলো বর্তমানে দেওয়ানী মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে আদালত অযৌক্তিক সময় প্রার্থনা, অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব বা প্রক্রিয়ার অপব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ (cost) আরোপ বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
← Back to All Articles