বিকেল হলেই জমে ওঠে বিন্টুদের পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ। মাঝে মাঝে দর্শকের ভীড় পেনু পালের মাঠের চারপাশটা উপচে গাছে এবং বাড়ীর ছাদে গিয়ে পড়ে। পটলতোলা, ঠ্যাংভাঙ্গা, হাইতোলা, হাঁড়কাপানো, মাছিমরা, শাকসবজি, পন্ডশ্রমের মত নামকরা ক্লাবগুলোও এ মাঠে খেলে গেছে। সেবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠে গেল বিল্টুদের ‘আক্কেলপাড়া হাঁচিমারা ক্লাব’। প্রতিপক্ষ দোর্দন্ড প্রতাপশালী ‘ঘুটেপাড়া হাইতোলা ক্লাব’। সেই ফাইনাল ম্যাচে ঘটে যাওয়া যত কান্ড নিয়েই আজকের গপ্পো। বিল্টুদের দল হাঁচিমারা ক্লাব টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। দলের বাকিরা প্রথমে একটু গোঁ গোঁ করলেও পরে ক্যাপ্টেন গদাধরের সিদ্ধান্তই মেনে নেয়। তার কারন গদাধরের ক্রিকেট জ্ঞান বিল্টুদের কাছে প্রায় উইজডেনের কাছাকাছি। একটু নাড়া দিলেই হলো, ব্যাস। ব্রাডম্যান-লারা-টেন্ডুলকার ঘুরিয়ে এনে একেবারে ফেলবে এনে মাশরাফি বিন মূর্তজার ঘাড়ে। সুতরাং কার ঘাড়ে কটা মাথা যে তাঁর কথায় দ্বিমত পোষণ করে।
সেরা পেসার চিংকুকে দিয়ে বোলিং শুরু। অপর প্রান্তে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে ‘ঝামাঘসা’ মুখের এক ব্যাটসম্যান। একটা মাছি ওর নাক আর চোখের মাঝখানে এসে কিছুক্ষণ যাবৎ ডিসটার্ব করছিল। দৌড়ে এসেও প্রথম বলটা ডেড হলো। ভয় পেয়েছে বলে রব উঠলো সারা মাঠে। ব্যাটসম্যান তেঁতে উঠলো মনে মনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল ‘ঝামাঘসা’ ব্যাটসম্যান কি বস্তু! দুটো বল একটু দেখে শুনে খেলার পর সাক্ষাৎ যমের মূর্তি ধারণ করল সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোলার আর ফিল্ডারদের ঘাম ছুটিয়ে দিয়ে বাউন্ডারির বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল চারদিকে। রানের সুনামি বয়ে গেল গোটা হাঁচিমারা ক্লাবের উপর দিয়ে। এরপর হাই তুলে-তুলেই ছক্কা হাঁকাতে লাগল হাইতোলা ক্লাব।
অন্যদিকে হাঁচিমারা ক্লাব বল করছে আর কুড়োচ্ছে, কুড়োচ্ছে আর বল করছে। অয়ন, কিচলু, বুনন, ত‚ণ এসব সেরা বোলারদের তুলোধুনো হতে দেখে বিজ্ঞ ক্রিকেট মস্তিষ্ক গদাধরেরও হৃদক¤প শুরু হয়ে গেল। বোলিং চেঞ্জ করতে করতে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। একদিকে বল তুলোধুনো হচ্ছে, অন্যদিকে দর্শকদের দুয়ো। আধমরা মন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিন্টুরও আর ভাল লাগছে না। ভাবছে, বাইরে গিয়ে একটু বাদাম টাদাম চিবিয়ে এলে ভালো হতো। গদাধর ডাকতেই এগিয়ে এলো বিল্টু। ভাবল, বেশ ভালোই হলো। পানি টানি আনাবে হয়তো। এই সুযোগে একটু বাইরেও ঘুরে আসা যাবে। কিন্তু একি! দিশাহীন গদাধর বিল্টুর হাতেই বল তুলে দিচ্ছে। বিল্টু বলল, ”কি, বল চেঞ্জ করে আনতে হবে? ঠিক আছে যাই...।” গদা ধমক দিয়ে বলল, ”গাধা, গিয়ে বল কর।” এ কথা কাকে বলছে? প্রথমে বুঝতে পারল না বিল্টু। খানিক পরে বুঝতে পেরে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল। মুহুর্তেই বিল্টুর মুখবর্ণ সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো এতটা আতংকিত হতো না। এমন ভাবে কাঁপা শুরু করল যে, পায়ের হাড্ডিগুলো একটার সাথে একটা লেগে ঠাস ঠাস আওয়াজ হতে লাগল। বার দুয়েক হাত ফসকে বল পড়ে গেল। ভাবল সেও পড়ে গিয়ে মাটির তলে ঢুকে যেতে পারলে বেশ হতো। এত ঝক্কি! অন্যদিকে ‘ঝামাঘসা’ আরামসে পানি খাচ্ছে। দু'একজন এসে ওর হাত-পা ম্যাসেজ করে দিচ্ছে।
একটু পরেই উইকেটের সামনে দাঁড়াবে কথাটা- ভাবতেই গা কেমন গুলিয়ে আসছে বিল্টুর। ক্ষণিকের জন্য অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে গেলেও তো ভালো হতো। চারু পিসির ফিটের ব্যামো আছে। ফিট হলেই তেল-জলে মাথা আর পা ঘষে দেয় ঝি জগো। কিন্তু কিভাবে ফিট হতে হয় সেটাও আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। পড়ে শুয়ে থাকলেই হয়? নাকি দাঁত কপাটি লাগিয়ে রাখতে হয়? কিন্তু তাতে দমবন্ধ হয় না? হাজারো প্রশ্ন জাগে মনে মনে। ভাবে, ওরে বাবা! গদা এসে ধমকালে তো দাঁতের কপাটি না খুললে আর উপায়ন্তর থাকবে না। ভান ধরাও অনেক কষ্টের কাজ। নাকি দুহাত তুলে বল ছোড়ার ভঙ্গি নিয়ে দৌড় শুরু করার ভান করে উল্টোদিকে পগার পার হবে। সপ্তাহ খানেক আর এ মুখো হবে না। সেই ভালো। যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু গোল বাঁধলো যখন বাউন্ডারি পার হবে তখন। কি হলো, হঠাৎ কেন জানি সেজ দাদুর কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলতেন, জানিস গোবরা রবীন্দ্রনাথের একটি গান আছে-“সংকোচেরই বিহŸলতা নিজেরই অপমান/ সংকেটর কল্পনাতে হয়োনা ম্রিয়মান।” ভয়-সংকোচ এ জাতিকে বড় হতে দিল নারে। এ বিষয়টা রবীন্দ্রনাথকেও কষ্ট দিত। আত্মসম্মান না থাকলে বেঁচে থেকে কি লাভ। তারচে' বরং মরে যাওয়াও অনেক ভাল। কথাগুলো ভাবতেই কোত্থেকে এক ঝাঁক চড় এসে দু'গাল ধরিয়ে দিলে। কিছু ঠাউরে উঠতে না পেরে ভাবল গদাই হবে হয়তো। তাকিয়ে দেখল না সে তো ৩০ গজ দূরে। পেছন দিক ফিরতেই সেইম সাইজের আরেক ঝাঁক চড়। হতভম্ব হয়ে গিয়ে দিকবিদিক ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, কে কে? বাতাস থেকে শব্দ ভেসে এলো, “ভয় পাবি তো আরো চড় খাবি, যা গিয়ে বল ছোড়।” যেদিকেই ছুটছে শব্দরাশিও তার পিছু পিছু যাচ্ছে।
ঐদিকে গদাধর তাড়া দিচ্ছে- কিরে, অমন রাউন্ড দিচ্ছিস যে বড়? তাড়া করে বল ছোড়। ফাইন হবে, ¯ে¬া ওভার রেটে পড়ব। যেদিকেই যায় সেদিকেই অদৃশ্য হাওয়ার গাট্টা। শেষমেষ টিকতে না পেরে নিয়ম মত সোজা উইকেটের দিকেই দৌড়াতে লাগল। মনে মনে ভাবল, যাচ্ছলে, ভয় পেলে আর এক ঝাঁক চড়। যাই হোক, প্রথম বল ওয়াইড। এবং যথারীতি ক্যাপ্টেনের ধমক। ভাবল, ধমক ভাল, চড় নয়। এবার নো বল। গদা এবার বলল, “কিরে, শুরু করেছিস কি!” এর পরেরটা বিল্টুরই পায়ের কাছে পড়ল। গদাধরের মাথায় হাত। ভাবল, সে কাকে দিতে কার হাতে দিয়ে দিল বল! তবুও ক্রিকেট জ্ঞান থেকে কিছুটা ধৈর্য্য ধার নিয়ে শ্রান্ত হবার ভঙ্গিতে উচ্চ ¯^রে বলতে লাগল, আরে সোজা মার। ড্রপ করা। ওভার শেষ কর। ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে বিল্টু। কিন্তু ভয় পাচ্ছে না। ভাবছে, না, ভয় পেলে চড় এসে কান গরম করে দেবে। এইবার বলের লাইন লেন্থ ঠিক হলো। হলে কি হবে। ঐ যে ঝামাঘসা ব্যাটসম্যান এয়সা হাঁকালো, বল পাড়ার মাঠ ছাড়িয়ে চলে গেল একেবারে মাঠের পাশের ছয় তলার ছাদে।
দর্শক চেঁচিয়ে বলছে, এতো শুধু ছক্কা নয়, তিন ছয় আঠেরো হলো। বহুক্ষন পর বল ফিরে আসার পর ভাবল, এবার যদি বল হাঁট ছাড়িয়ে রেল ষ্টেশনের দিকে চলে যায়? যেই ভাবা সাথে সাথে আরেক ঝাঁক চড়। হুংকার এল, “ভয় পেলি কেন!” তোতলানোর ¯^রে বিল্টু বলল?,“অমন তুলে তুলে মারে যে।” “মারবে না বেটা গাধা, ইয়কার মার, বল পায়ের কাছে ফেল-দেখবি ষ্ট্যা¤প ফুঁস।” অদৃশ্য চড়ের বানী শুনে বিল্টু আবার দৌড় শুরু করল। না, আর ভয় পাওয়া যাবে না। যেই কথা সেই কাজ। পরের বল দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে মিডল ষ্ট্যা¤প উড়ে গিয়ে পড়ল উইকেট কিপারের গ্লাভসে। সবার চোখ চড়ক গাছ। বিল্টু চোখ কচলে দাঁড়িয়ে ভাবছে, টিভির লাইভ টেলিকাষ্ট হচ্ছে। একটু পরে রিপ্লে দেখাবে। অয়ন, কিচলু, বুনন, ত‚ন, চিঙ্কু এরা এসে আউট বলে চিৎকার দিয়ে যখন জাপটে ধরতে এল তখন সম্বিৎ ফিরে পেল সে। হাঁচিমারা ক্লাবের সমর্থকদের মনে কাঠফাঁটা রোদে খানিক বাতাসের ঝটকা এসে লাগল। তবে এতক্ষনে রান যে জায়গায় নিয়ে তুলেছে ঝামাঘসা, আরেকটু থাকলেই হতো! পরে শুয়ে শুয়ে বল করলেও এ রান টপকানোর কেউ ছিল না। যাক, ওয়ান ডাউনে এল দশাসই মারকুটে হিসেবে পরিচিত এক ব্যাটসম্যান। খানিকটা ¯^স্তি খানিকটা অবিশ্বাসে দৌড় শুরু করল বিল্টু। যাক কিছু সময়ের জন্য হলেও বকাঝকা মুক্ত সে। মারকুটে দশাসই যেন মুগুর নিয়ে দাঁড়িয়ে গজরাচ্ছে। ‘ঝামাঘসা’র বোল্ড আউটের প্রতিশোধ নেবে সে। অর্ধেক দৌড়ে এসে মারকুটের ভাবগতিক দেখে বিল্টুর বুকে আগের মত ধরাস ধরাস শুরু হল। সাথে সাথে দুপাশ থেকে দু' ঝাঁক চড় খেয়ে প্রানপণে এগিয়ে গেল সে। মারকুটে ভাল বোলারদেরই পাত্তা দেয় না। সে এগিয়ে এল ছক্কা হাঁকাবে বলে। এবার বল অফ সাইডে পড়ে সুইং করল। মারকুটে পিছনে তাকিয়ে দেখল তার লেগ স্ট্যা¤প মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শূন্যে ব্যাট ছুড়ে, আক্ষেপ করতে করতে যখন মারকুটে বিদায় নিচ্ছে তখন বিল্টুকে কোলে তুলে নাচছে সবাই। শুধু বিল্টু ভেবে পাচ্ছে না এ মুহুর্তে কি করতে পারে সে। কিছু না পেয়ে একটু মাথা চুলকে নিল সে। পর পর দুই উইকেট! এবার হ্যাট্রিক চান্স। পুরো মাঠসুদ্ধ চেঁচাচ্ছে। অন্যদিকে বিল্টুর প্রাণ ওষ্ঠাগত। হাইতোলা ক্লাব তাদের সেরা ব্যাটসম্যান পাঠাতে বাধ্য হলো। যেমন জমকালো চেহারা, তেমনি তার চাহনি। কিন্তু বিল্টুর ভয় পাবার সময় নেই। ভয় পেলেই একঝাঁক চড় এসে কান-গাল গরম করে দিয়ে যাবে। পরের বল মেরেই পা পিছলে পড়ে গেল। সকলের সম¯^রে চিৎকার- ‘হাউ ওয়াজ দ্যাট’।
বিল্টু ধূলো ঝেড়ে প্যান্ট টেনে তুলে উঠে এসে একজনের কনুইয়ের ফাঁক দিয়ে দেখল, আ¤পায়ার তর্জনী উঁচিয়ে আউট ঘোষনা দিচ্ছে। মানে হ্যাটট্রিক!! নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখল, একি ¯^প্ন নাকি সত্যি! না এতো ¯^প্ন নয়। হয়েছে কি, ‘জমকালো’ সুইপ শট খেলতে গিয়ে ক্রস ব্যাট খেলছিল, আর বল সরাসরি এসে তার প্যাডে আঘাত হানে। পরিষ্কার এল.বি.ডব্লিউ হয়ে মাঠ ছাড়ছে ‘জমকালো’। এবার বিল্টুকে কাঁধে নিয়ে পুরো মাঠ চক্কর দিল টিমমেটরা। ওদিকটায় চলছে দর্শক- সমর্থকদের বাঁধভাঙ্গা উল্লাসধ্বনি। সেবার বিল্টু একাই ধ্বসিয়ে দিয়েছিল ‘হাইতোলা ক্লাব’কে। শুরুটা ভালো করেও এরপর রান আর বেশি দূর এগোল না। ফলে সে রান সহজেই টপকে চ্যা¤িপয়ন হল আক্কেলপাড়া হাঁচিমারা ক্লাব। ম্যান অব দি ফাইনাল হলো বিল্টু। ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্ক গদাধর ও ভেবে পেল না, কি হতে কি হয়ে গেল। যদিও তার ক্যাপ্টেনসির বাহবা আদায় করতে মোটেই সে ক্লান্ত ছিল না। যাক, সেতো গেল। কিন্তু একটা জিনিস রয়ে গেল। তাহলো-চড়। উঠতে বসতে সেই চড় মশাইয়ের কথাই পালন করতে হয় বিল্টুকে। পড়া ফাঁকি, ক্লাস ফাঁকি, পড়ার টেবিলে ঝিমানো, বাথরুমে গিয়ে বসে থাকা, ক্লাসে বসে দুষ্টমি, মায়ের কাছে মিথ্যে বলা, বন্ধুদের ঠকানো, ¯^ার্থপর চিন্তা এই চড়ের কল্যানেই এই সব কিছু একেবারে উধাও।
পাড়ার মোড়ে কিছু বখাটে স্কুলের মেয়েদের উত্যক্ত করত। কেউ ভয়ে কিছু বলত না। এর কারন, লোকদের অকারণ মারধর, কথায় কথায় দা-ছেনী-হকিস্টিক নিয়ে বেরিয়ে পড়া, নেশায় বুদ হয়ে থাকা ওদের ¯^ভাবে পরিনত হয়েছে। ওদের সর্দার ছিল রঙা। একদিন বিল্টুরা স্কুলের থেকে ফেরার পথে দ্যাখে এক ছাত্রীকে পথ আটকে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছিল রঙা ও তার দল। বিল্টুর মনে মনে বেশ রাগ হলো। বন্ধুদের বলল, “চল বেটাদের গিয়ে ঠেঙ্গাই।” কেউ সাহস পেল না। একজন বলল, “বেশতো তুই আগে চল।” এ কথা শুনেই বিল্টুর গলা শুকিয়ে গেল। ভাবল, রঙা কিছুদিন আগে কথায় কথায় পাড়ার এক বয়স্ক ভদ্রলোকের গায়ে হাত তুলে ফেলেছে। এ কথা ভাবার সাথে সাথে একগুচ্ছ চড়ের আগমন তক্ষুনি শুনতে পেল সে। আগেভাগেই মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলল, “ঠিক আছে-ঠিক আছে; ভয় পাই নি! তবে বলে দিচ্ছি, রঙা কিন্তু ডেঞ্জারাস। লোকেদের মারধর, পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়া ওর কাছে কোন ব্যাপারই নয়।” হাওয়ায় হাসির শব্দ শোনা গেল। বলল, “তুই গিয়ে শুরু কর। বাকীটা দেখা যাবে।”
এরপর বিল্টু সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “চল তো গিয়ে দেখি। প্রথমে রঙা ওদের মুড দেখে ঠাট্টা- ইয়ার্কি শুরু করে দিল। বলল, “বড়দের মধ্যে ছোটরা কি? যাও গিয়ে লেবেনচুস খাও।” বিল্টু এগিয়ে এসে বলল, “দাও লেবেনচুস দাও।” রঙা চোখ কচলে অবাক হবার ভান করে বলল, “সাব্বাস! এইতো দেখি চোখ ফুটেছে, মুখ ফুটেছে......আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক এই মুহুর্তে ঠাস করে এক চড় বিদ্যুৎ চমকের মত বিল্টুর হাত হয়ে ওর গালে গিয়ে পড়ল। থ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রঙা। এরপর পেছনে থাকা বন্ধুরা একসাথে কয়েক ডজন চড়ের আওয়াজ পেল। যেন ওস্তাদ জাকির হোসেন তবলা বাজাচ্ছেন। বাকী বন্ধুরা অন্য বখাটেদের উপর চড়াও হলে চড়ের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এ যেন ফটোস্ট্যাট মেশিনে জেরক্স চড় তৈরী হচ্ছে। এক চড় এক ডজন ছাপা হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে উৎসাহের মাত্রা বেড়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ চড়ের টেস্ট ম্যাচ চলল। সেই থেকে রঙা আর তার দল জীবনে কখনো এ পাড়ামুখো হয় নি। স্কুলের প্রাইভেট এক শিক্ষক, তার কাছে না পড়লে ফেল করাবে- বলে শাসাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের। অন্যদিকে বেশীর ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবারই এই বাড়তি ব্যয়ের সামর্থ্য রাখে না। অথচ ভয়ে কেউ মুখ খুলতেও পারছে না। ক্লাসের ফাঁকে সকলে মিলে কথাবার্তা হচ্ছিল, কিভাবে এর প্রতিবাদ ও প্রতিকার করা যায় তা নিয়ে। প্রধান শিক্ষককে জানাতে পারলে সবচে ভাল হয়। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? হঠাৎ সবার সেদিনের চড়ের টেস্ট ম্যাচের কথা মনে পড়ে গেল। ঐক্যমত হলো, বিল্টুই পারবে। প্রধান শিক্ষকসহ সবার সামনে সেদিন বিল্টু সৎ সাহসের সাথে বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি কোচিং এর ওই শিক্ষককে তিরস্কার করেন।
আমাদের সমাজে সচরাচর যা দেখা যায়- যারা সৎ তারা সাহসী নয়, আবার যারা সাহসী তারা সৎ নয়। বিল্টুর ঘটনাটা সবার সে ধারনা পাল্টে দিয়ে গেল। শিক্ষকসহ বাকীরা ভাবল, ক্লাসের এককোণে পড়ে থাকা এক দুর্বল চিত্তের ছাত্র কিভাবে এত পরিবর্তিত হলো। রেজাল্ট ভাল করছে। সবদিক দিয়ে সৎসাহসী ও চৌকস হয়ে উঠছে। মূলতঃ চড় মশাইয়ের কল্যাণে বিল্টুর চরিত্রের বৈশিষ্ট্যে ভয়টা কেটে গিয়ে সাহসটা ¯^ভাবসুলভ হয়ে গিয়েছে। তাই এখন আর চড় মশাইকে তেমন একটা আর্বিভাব হতে দেখা যায় না। কিন্তু হঠাৎ একদিন বিল্টু মনে মনে ভাবে তবে কি সেজদাদুর সেই কথাগুলো চড়ের বেশে এসে মনে থেকে ভয় দূর করে তার বিবেক আর মর্যাদাবোধকে জাগিয়ে দিয়ে চলে গেল ! ! !
← Back to All Articles