· Civil

দেয়ালের ভূত

একটি রহস্যময় গল্প- যেখানে দেয়ালও কথা বলে

দেয়ালের ভূত
তপু আগে কখনোই ভূত বিশ্বাস করতো না। এখনো করেনা । এমনকি কথা-বলা দেয়ালটি যেদিন ওর সাথে প্রথম কথা বলে উঠল, তখনো নয়। এরপর বেডরুমের দেয়ালের সাথে তার অনেকবারই কথা-বার্তা হয়। তপুকে তো তোমরা আগে থেকেই চেনো। ঐ যে চেয়ার-টেবিল-সোফা-আলমারি-বুকসেলফ- সব আসবাবপত্রের ভাষা বুঝতো যে ছেলেটি। এমনকি এদের সাথে কথাও কইতো। মনে নেই, সেই তপু! এবার মনে পড়েছে? তো সেই তপু!! তপু একদিন দেয়ালকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা তুমি কি দেয়ালের ভূত?’ দেয়াল অবলীলায় জবাব দিল, ‘এমা ভূত হতে যাব কোন দু:খে। আমি কি মরেছি নাকি। আমিতো জলজ্যান্ত আস্ত একটা দেয়াল।’ তখন সুযোগ বুঝে তপু আরেকখানা প্রশ্ন জুড়ে দিল এর সংগে,‘ তোমার বাপঠাকুর্দা তো বেঁচে নেই। তবে তেনারা তো অবশ্যই ভূত হয়েছেন।’ এ কথায় দেয়াল নীরব রইল। তপু আবার জিজ্ঞেস করে,‘তোমার ধ্বংসের পর মানে তোমাকে ভেংগে ফেলার পরও কি তুমি কথা কইবে?’ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেংগে দেয়াল বললো,‘ তোমার যা পরিণতি আমারও ঠিক তাই হবে। হ্যাঁ তুমি তা অবশ্যই জানো।’ তপুর মুখ থেকে অবচেতনভাবেই বেরিয়ে এলো দুটি শব্দ- ‘মহাজাগতিক কণা’। এরপর সেদিন কথা আর বেশী জমে নি। তপুর সবচে’ প্রিয়বন্ধু রাসেল। একবার ওর সাথে তপুর তুমুল ঝগড়া হয়। আর সেই থেকেই আড়ি, মানে কথা বলা বন্ধ, লাইন কাট-আপ। বিবাদের বিষয়টা মনে না থাকলেও রাগটা আজও মনে রয়ে গেছে। তারপর থেকে তপুর মনটা কেমন খাপছাড়া আর বিষন্ন হয়ে থাকে। তপুর মন খারাপ হলে বেডরুমের দেয়াল বুঝতে পারে। নিজের থেকে আলাপ জমাতে চেষ্টা করে। সেদিন দেয়ালটির কথায় বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল তপু। সে বিস্ময়ের ঘোর কাটতেও অনেকটা সময় লেগেছিল তার। সে বিস্ময় হৃদয়ে ঝংকার তোলে। সবকিছু নতুন করে ভাবতে শেখায়। সে তন্ময় হয়ে ভাবে অনেকক্ষন। ভাবতে ভাবতে ভাবনার জগতে তলিয়ে যেতে থাকে। দেয়ালটি কি বলেছিল সেদিন তাকে? কথায় কথায় সেদিন দেয়াল তাকে বলেছিল,‘ দেখো, তোমাদের প্রত্যেকটি মানুষের মনেও অদৃশ্য দেয়াল থাকে। একটি-দুটি নয়, অনেকগুলো। সেই দেয়ালগুলো সে নিজেই তৈরী করে। নিজের অজান্তেই। আর সেখানে ইটের বদলে থাকে অহংকার। সিমেন্ট আর বালির বদলে থাকে বিদ্বেষ আর ঘৃণা। আর রংয়ের বদলে থাকে ব্যক্তিত্বের মুখোশ। এই দেয়ালগুলিই তাকে অপরের সাথে মিলতে দেয় না। মাঝেমাঝে মমতা আর বেদনার অশ্রæ এসে দেয়ালগুলোকে ভাংগে ঠিকই। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সে আবারো তৈরী হয়-নিজের অজান্তেই।’ কথাগুলো তপুকে বেশ নাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন। তার রেশ এখনো যায় নি। তপু ভাবে, কথাগুলো বোঝার বয়স এখনো তার হয় নি। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ আসে। মায়ের ডাক, রাতের খাবারের তাড়া। ‘আসছি মা,- দরজা না খুলেই তপুর জবাব। মায়ের পুনরুক্তি,‘ আসছি নয়, এখুনি আয়। কাল পরীক্ষা আছে না, তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।’ তপু আর জবাব দিল না। দরজা খুলে নি:শব্দে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু খাওয়ার পুরোটা সময় জুড়ে সে ভাবলো। তার মনে হলো খাবার ঘরের পেছনের দেয়ালটাও তার দিয়ে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তপুর হঠাৎ আনমনা হয়ে যাওয়া, চুপ হয়ে যাওয়া -এসবে মা আগে থেকেই অভ্যস্ত। চুপ করে থাকা মানে মনের ভেতর নতুন কিছু না কিছু চলছে। মা জানে তার বিজ্ঞানী ছেলের কান্ড। তার ছেলেটি নাকি চেয়ার, টেবিল, টুল, আলনা, সেলফ- এসবকিছুর ভাষা একদিন আবিস্কার করে ফেলবে। মা মুখ টিপে টিপে হাসছে। চোখে চোখ পড়তেই মা-ছেলে দুজনেই ফিক করে হেসে ফেললো। এরপর চলল হো হো করে বাড়ি ফাটিয়ে হাসির কলরব। হাসি থামিয়ে মা বলল, জানিস আমি বিজ্ঞানী এডিসনের মায়ের মত হতে চাই। এডিসনের মায়ের গল্পটা তপু তার মাকে একবার শুনিয়েছিল। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ছাত্র হিসেবে এতটাই খারাপ ছিল যে, স্কুলের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তার মাকে লিখা একখানা চিঠি হাতে ধরিয়ে পত্রপাঠ তাকে স্কুল থেকেই বের করে দেয়া হয়। এডিসনের মা চিঠিটা হাতে পেয়ে পড়ে বেশ কিছুক্ষন নীরব রইলেন। ছোট এডিসন জানতে চাইলেন যে , চিঠিতে কি লিখা রয়েছে। তখন মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,‘ এতে লেখা আছে- আমার ছেলে এতই মেধাবী যে, তাকে পড়ানোর মত যোগ্য শিক্ষক ঐ স্কুলে নেই।’ সেদিন ছোট্ট এডিসন কিছুটা অবাক না হয়ে পারল না। কিন্তু মাকে ভালবাসত বিধায় মায়ের কথায় আস্থা রেখেছিল সে। গোটা পৃথিবী জানে সেদিন মায়ের কথায় আস্থা না রাখলে এডিসন পরবর্তীতে এত বড় বিজ্ঞানী হতে পারতেন না। টেলিফোন, বৈদ্যুতিক বালব সহ ১২৫টিরও বেশী আবিস্কারের আবিস্কারক হতে পারতেন না। আজ কেউই এডিসনের মাকে দেয়া শিক্ষকদের সেই চিঠি খুঁজতে যান না। সত্য যে সুন্দর- কথাটি সবসময় ঠিক নাও হতে পারে। মাঝে মাঝে মিথ্যাও সুন্দর হয়। যদি তাতে মিশে থাকে মমতা, ভালোবাসা ও মানুষের কল্যান। যার দৃষ্টান্ত এডিসন। মায়ের মমতা ও ভালোবাসা মিশ্রিত মিথ্যা এডিসনকে একদিন বড় বিজ্ঞানী ও বড় মানুষে পরিণত করেছিল। যার আবিস্কার গোটা দুনিয়ায় জ্বেলেছিল সভ্যতার আলোবর্তিকা। তপু প্রতিদিনকার মত আজও ভোরে জগিং ও ব্যায়ার সেরে খানিকক্ষন মেডিটেশন করল। দেয়ালের কথাগুলো ভেবে নিজে নিজেকেই বলল, আচ্ছা বড় মানুষদেরও কি ভেতরে দেয়াল থাকে! অহংকার, বিদ্বেষ, ঘৃণা আর মুখোশের দেয়াল! কথাটা শুনে বাগানের পাশে থাকা দেয়ালটা জবাব দেয়,‘ দেয়ালখানা ভেঙ্গেই তো তিনি বড় হয়েছেন। তা না ভাঙ্গলে তিনি যে ছোটই রয়ে যেতেন।’ তপু পেছন ফেরে এবার জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে বললো,‘ তবে কি কথাটা সব মানুষের বেলায়ই খাটে?’ বাগানের দেয়াল উত্তর দেয়,‘ অতি অবশ্যই। কবিই তো বলে গেছেন, বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে।’ ‘কিন্তু সাধারণেরা কেন বড় হতে পারে না’, তপুর পুন:প্রশ্ন। দেয়াল একটু হেসে জবাব দেয়,‘ নিজের অভ্যাসের বৃত্ত থেকে বেরোতে না পারার জন্য’, দেয়ালের সংক্ষিপ্ত জবাব কনিকা। তপু আর কিছুই বলল না। দেরী না করে উঠে দাঁড়ালো। আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, স্কুলে গিয়ে বন্ধু রাসেলের সাথে আজই কথা বলবে সে। ভুলত্রæটি যারই হোক ক্ষমা চেয়ে কিংবা ক্ষমা করে সব মিটমাট করে নেবে। তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের মাঝে যে দেয়াল তৈরী হয়েছে। তাকে যে আজই ভাঙ্গতে হবে। তপুর বোধদয় দেখে ও মনের কথা বুঝতে পেরে দেয়ালটি আর কিছুই বলল না । শুধু খানিক মুচকি হাসল। সকাল বেলা রোদ্দুর তখন সবেমাত্র মাটিতে পা ফেলেছে।.... ----------------- [লেখক-এডভোকেট, জেলা জজ কোর্ট, চাঁদপুর]
← Back to All Articles
Click to Chat