· Civil

জমি থেকে বে-আইনীভাবে উচ্ছেদ হলে কি করবেন?

বাংলাদেশে যদি কোনো ব্যক্তি জমি থেকে বেআইনিভাবে উচ্ছেদ হন, তাহলে আইন নিজের হাতে না নিয়ে দ্রুত আইনি প্রতিকার গ্রহণ করা উচিত।

জমি থেকে বে-আইনীভাবে উচ্ছেদ হলে কি করবেন?
করণীয়গুলো হলো— ১। প্রমাণ সংগ্রহ করুন ২। খতিয়ান, দলিল, নামজারি, খাজনার রসিদ, দখলের প্রমাণ। ৩। উচ্ছেদের সময়ের ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য সংগ্রহ করুন। ৪। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা অভিযোগ করুন ৫। জোরপূর্বক উচ্ছেদ, ভাঙচুর বা হামলার ঘটনা থাকলে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে। ৬। দেওয়ানি আদালতে মামলা করুন পরিস্থিতি অনুযায়ী— ১। দখল পুনরুদ্ধারের মামলা (Recovery of Possession)। ২। প্রয়োজন হলে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের মামলা। ৩। যদি মামলা চলাকালে প্রতিপক্ষ আরও ক্ষতি করার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা করা যেতে পারে (সাধারণত দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXXIX Rules 1 ও 2 অনুযায়ী)। ৪। তামাদি (Limitation) মাথায় রাখুন ৫। উচ্ছেদের পর অযথা দেরি না করে দ্রুত মামলা করা উচিত। প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে তামাদির সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে। ৬। জোর করে পুনরায় দখল নেওয়ার চেষ্টা করবেন না এতে নতুন ফৌজদারি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ১। যদি আপনি আইনগত মালিক হন কিন্তু দখল হারিয়ে থাকেন, তাহলে সাধারণত দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করা হয়। ২। যদি মালিকানা নিয়েও বিরোধ থাকে, তাহলে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের মামলা অধিক উপযুক্ত হতে পারে। ৩। উচ্ছেদ যদি সরকারি সংস্থা বা প্রশাসনের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিকারের ধরন ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশে জমি থেকে বেআইনিভাবে উচ্ছেদ হলে কোন পরিস্থিতিতে কোন মামলা করতে হবে, তা নিচে তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হলো। ভাঙচুর, হামলা, লুটপাট বা জোরপূর্বক উচ্ছেদ ফৌজদারি মামলা অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় এতে জমির স্বত্ব বা দখল ফিরে পাওয়া যায় না Specific Relief Act-এর ৯ ধারার মূল বৈশিষ্ট্য- ১. বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি উচ্ছেদের আগে বৈধ দখলে ছিলেন। ২. বিবাদী আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জোরপূর্বক বা বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করেছে। ৩. মালিক কে—সেটি এই মামলার মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো পূর্ববর্তী দখল। ৪. উচ্ছেদের ৬ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। ৫. আদালত সন্তুষ্ট হলে বাদীকে পুনরায় দখল ফিরিয়ে দিতে পারেন। যদি ৬ মাস অতিক্রম হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে সাধারণত ৯ ধারার মামলা করা যাবে না। তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করতে হবে এবং মালিকানার ভিত্তিতে প্রতিকার চাইতে হবে। অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার ভিত্তি মূল মামলার সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা চাইতে হলে সাধারণত আদালতের কাছে দেখাতে হবে— ১। Prima facie Case আছে। ২। Balance of Convenience বাদীর পক্ষে। ৩। নিষেধাজ্ঞা না দিলে Irreparable Loss হবে। ৪। বিবাদী দখল পরিবর্তন, নির্মাণ বা হস্তান্তরের চেষ্টা করছে। ৫। ব্যবহারিক পরামর্শ - উচ্ছেদের পরপরই ছবি, ভিডিও, সাক্ষী ও প্রাসঙ্গিক দলিল সংগ্রহ করুন। - প্রয়োজনে থানায় জিডি বা ফৌজদারি অভিযোগ করুন। - অযথা বিলম্ব না করে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করুন। -জোর করে পুনরায় দখল নেওয়ার চেষ্টা করবেন না; আদালতের মাধ্যমেই প্রতিকার চাওয়া নিরাপদ। Specific Relief Act, 1877-এর ৮ ধারা (Section 8) মূলত স্থাবর সম্পত্তির নির্দিষ্ট পুনরুদ্ধার (Recovery of Specific Immovable Property) সম্পর্কে বিধান প্রদান করে। ৮ ধারার সারমর্ম যে ব্যক্তি কোনো স্থাবর সম্পত্তির আইনগত মালিক (entitled to possession), তিনি আইনানুগ উপায়ে সেই সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারেন। অর্থাৎ, বাদীকে প্রমাণ করতে হবে— * তিনি সম্পত্তির বৈধ মালিক বা দখল পাওয়ার অধিকারী; * বিবাদী বেআইনিভাবে সম্পত্তির দখল করে আছে; * তাই আদালত বিবাদীর কাছ থেকে দখল ফিরিয়ে দিয়ে বাদীকে দখল প্রদান করবেন। ৮ ধারা ও ৯ ধারার পার্থক্য ৮ ধারায় মালিকানা বা দখল পাওয়ার আইনগত অধিকার প্রমাণ করতে হয়। ৯ ধারা মতে শুধু পূর্ববর্তী দখল এবং বেআইনি উচ্ছেদ প্রমাণ করলেই হয় ৮ ধারা মতে স্বত্ব (Title) বিচার্য বিষয। ৯ ধারা মতে স্বত্ব বিচার্য নয়। ৮ ধারা মামলায় সাধারণ তামাদি আইন প্রযোজ্য ১২ বছর। ৯ ধারা মতে উচ্ছেদের ৬ মাসের মধ্যে মামলা করতে হয়। ৮ ধারা প্রকৃত মালিকের জন্য উপযুক্ত প্রতিকার। ৯ ধারা হলো জোরপূর্বক উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তির দ্রুত প্রতিকার। ৮ ধারার মামলায় বাদীকে সাধারণত যা প্রমাণ করতে হয়ঃ ১। সম্পত্তির ওপর তাঁর বৈধ স্বত্ব বা দখল পাওয়ার অধিকার আছে। ২। বিবাদী বেআইনিভাবে দখল করে আছে। ৩। বাদী আদালতের মাধ্যমে দখল পুনরুদ্ধারের অধিকারী। উদাহরণ ধরা যাক, ক-এর নামে রেজিস্টার্ড দলিল, নামজারি ও খাজনা রয়েছে। খ জোরপূর্বক জমি দখল করে নিয়েছে। ক যদি নিজের মালিকানার ভিত্তিতে জমি ফেরত চান, তাহলে তিনি ৮ ধারার নীতির আলোকে স্বত্বের ভিত্তিতে দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করতে পারবেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশে পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংশোধন ও বিশেষ আইনের কারণে বাস্তবে ৮ ধারাকে এককভাবে উল্লেখ করে মামলা করার চেয়ে সাধারণত স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের মামলা (প্রয়োজন অনুযায়ী Specific Relief Act, 1877, Code of Civil Procedure, 1908 এবং Limitation Act, 1908-এর প্রাসঙ্গিক বিধানসহ) দায়ের করা হয়। তাছাড়া ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৭ ও ৮ ধারায় জবরদখলকৃত ভূমি দ্রুত উদ্ধারের একটি বিশেষ প্রতিকার রাখা হয়েছে। সংক্ষেপে পদ্ধতিটি হলো— ১। আবেদন দাখিল- এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট যে ব্যক্তি ভূমির মালিক বা বৈধ দখলদার এবং জবরদখলের কারণে বেদখল হয়েছেন, তিনি আইনে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করবেন। আবেদনপত্রের সঙ্গে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, খাজনার রসিদ ও দখলের প্রাথমিক প্রমাণ সংযুক্ত করতে হবে। ২। নোটিশ প্রদান আবেদন গ্রহণের পর প্রতিপক্ষ জবরদখলকারীকে নোটিশ দিয়ে শুনানির সুযোগ দেওয়া হবে। ৩। তদন্ত ও শুনানি ৪। প্রয়োজনে সরেজমিন তদন্ত, ভূমি রেকর্ড পরীক্ষা, সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে। ৫। দখল পুনরুদ্ধারের আদেশ ৬। কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে জবরদখলকারীকে উচ্ছেদ করে প্রকৃত মালিক বা বৈধ দখলদারকে পুনরায় দখল ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন। ৭। আদেশ বাস্তবায়ন প্রয়োজনে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় আদেশ কার্যকর করে ভূমি উদ্ধার করে আবেদনকারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ৮। আপিলের সুযোগ আইনে নির্ধারিত ক্ষেত্রে আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থাও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ: এই আইন দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব ঘোষণা বা দখল পুনরুদ্ধারের প্রচলিত প্রতিকারকে সম্পূর্ণ বাতিল করেনি; বরং জবরদখলের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকার প্রদানের জন্য একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা চালু করেছে। দখল পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হলো শেষেরটি। এই আইনে মাত্র ৩ মাসের মধ্যে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
← Back to All Articles
Click to Chat