· Civil

ভরদুপুরে বেড়াল কান্ড

একটি হাস্যরসাত্মক রহস্যময় গল্প- একটি অদ্ভুদ বিড়ালের সাথে লেখকের কথোপকোথন

ভরদুপুরে বেড়াল কান্ড
ভরদুপুরে কবি নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার ডায়েরী’ পড়তে পড়তে বেশ করে ঝিমিয়ে নিচ্ছিলাম। কিছুদিন যাবৎ ভাল ঘুম হচ্ছে না। হঠাৎ পাশ ফিরে দেখি সবুজ রংয়ের প্লাস্টিকের মোড়াটার উপর বসে আছে একটি বাদামী-কালো রংয়ের ডোরাকাটা দাগের বেড়াল। তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার দিকে। কয়েক পলক তাকিয়ে আবার এদিক ফিরে টেবিলে মাথা রাখলাম। ‘কি ব্যাপার মোশয়!’ অদ্ভুদ এক মানবেড়াল (মানুষ+বেড়াল) শব্দ ধ্বণি কানে এসে বাজল। হকচকিয়ে গিয়ে চারদিকটা তাকাতেই দেখলাম সেই বেড়ালটি সামনের পা দুটিকে হাত বানিয়ে উঁচিয়ে ধরে আছে। বলল, এই যে আমি এখানে। ভাল করে পর্যবেক্ষন করে দেখতে লাগলাম এই পুতুলটার সুইচ কোনদিকে । আর কে-ইবা শয়তানি করে এটা রেখে গেল আমাকে বুদ্ধু বানানোর জন্য। সুইচ খুজঁতে এর পেছনে হাত নিতেই হোপ করে এক ধমক দিয়ে উঠল সে, ‘মি-ই-ই-অ-ও-ও’। বেড়ালেরা রাগলে সাধারনত ম্যাও শব্দ বিকৃত করে লম্বা করে অনেকগুলো ই, অ, ও এর সমাবেশ ঘটায়। যাহোক দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে আমি রীতিমত তাজ্জব বনে গেলাম পুরো ঘটনায়। কিছুই বলতে পারলাম না আর। শুধু তাকিয়েই রইলাম। ‘ব্যাপারখানা কি একবার বলুন দেখি’- চোখ মুখ নেড়ে অবাক হওয়া ভংগিতে বলে উঠল বেড়ালটি। এখন আমিই চাবি দেয়া পুতুলের মত বললাম, কিসের আবার কি? ‘না মানে এই অবাক হওয়ার ব্যাপারখানা কি ঘটল, তাই জিজ্ঞেস করলাম আর কি’, খুব ¯^াভাবিক ভঙ্গিতে বলল মান-বেড়ালটি। আমি বললাম, একটা বিড়ালের সাথে কথা বলছি-অবাক হব না! এবার বেড়ালটি বেশ তাচ্ছিল্যের ¯^রে বলল, কেন আপনার লেখা ‘পুষি আর টুসি’ গল্পে বেড়ালেরা কথা বলেনি? সভা করেনি? আমি খানিকটা যুক্তি দিয়ে বুঝাতে চাইলাম, সে তো বেড়ালে-বেড়ালে, বেড়ালের ভাষা বেড়ালই বোঝে। হাত তুলে বেড়ালটি বলতে শুরু করলো, থামুন মশাই, আপনারই লেখা তপুর পড়ার ঘর, ক্লাসঘর , দেয়ালের ভুত- এসব গল্পে চেয়ার-টেবিল-জুতার সেলফ এমনকি দেয়াল পর্যন্ত কথা বলতে পারে। আর আমরা বললে যত দোষ! যতসব মামদোবাজি পেয়েছেন! একদমে কথাগুলো বলে একটু থামল বেড়ালটি। দম নিয়ে বেড়ালটি আবার বলতে শুরু করলো, তা যাহোক বা না হোক যে কথা বলতে এসেছি, আমাদের বিড়াল রাজ্যের কতদূর এগুলো? সে খবরটাই তো নিতে এলাম। ঐ যে ছোট খোকার কাছে শিশু কিশোর মেলার গল্পখানা শুনে ভাবলুম কার কাছে গেলে প্রকৃত সংবাদ পাওয়া যাবে। তাই তো এক্কেবারে ¯^য়ং লেখকেরই কাছে এসে হাজির হলুম! আমি মনে মনে ভাবলাম, ওহ! তো ব্যাপারখানা তাহলে এ-ই! সোজাসাপ্টা দরজাটা দেখিয়ে দিয়ে বললাম, বেরিয়ে যাও, কোন সাহসে, কার অনুমতিতে আমার দুপুরের তন্দ্রা ভাঙ্গাতে এয়েছো (এসেছো)! কর্তা-মা, গুল্টে,ঝন্টু, ভোদর, রংচি এরা কেউ নেই? সেই সুযোগে? বোধহয় ভজহরিটাও আফিম খেয়ে কোথায় পড়ে আছে কে জানে। যাহোক এখন বেরোও! কাকস্যপরিবেদনা। কাকে বলছি! বেড়ালটি একেবারে নাছোরবান্দা। একটুও ভয় ন্ াপেয়ে সে বলল, শুধু মুখে বেরিয়ে যাও বললেই তো হবেনা, কথার জবাব দিন চলে যাচ্ছি। আমি বললেম, আরে যাও, একটা বিড়াল চাইতে এসেছে আমার কাছে প্রশ্নের উত্তর! বিড়ালটি হতদ্যম না হয়ে এবার মিনতি করে বলল, কত কষ্ট করে পাশের পাড়ার হুলো বেড়ালের কাকাতো ভাইয়ের বন্ধুর বান্ধবী মেনি বিড়ালের থেকে ঠিকানা যোগাড় করে আসতে হয়েছে জান! কথাটা শুনে আমার কেমন জানি উষ্মা লেগে উঠল। খানিকক্ষন চুপ করে রইলাম। কয়েকদিনের টানা পরিশ্রমে কøান্ত আমি। মনে মনে বললাম, একটা বিড়াল এসেছে আমার ইন্টারভ্যু নিতে! তাও আবার আমার গল্পের কাহিনী শুনে অনুপ্রানিত হয়ে! ভেবেছিলাম রনে ভঙ্গ দিয়ে বাছা রাসÍা মাপবে। কিসের কি। উল্টো আরো জমিয়ে বসল এবার। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলতে লাগল, আমাদের হাড়ভাঙ্গা এলাকায় ধলু, কালু, ডোরা, হুলো, ভোজা, কুজো সব বেড়াল গোপনে মিটিং শুরু করেছে। এরই মধ্যে চালের গুদামে, চিনির গুদামে, কুলুদের ভাড়ার ঘরে , চক্কোত্তিদের ছাড়া-বাড়ীর চিলেকোঠায় কয়েক দফা বসেছে। ‘ঐ যে চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়ে মজুতদার গুদামে রেখে- আপনার গল্পে আছে না, কিছু মুনাফালোভী শয়তান ব্যবসায়ী লাভের জন্য কোটি কোটি সাধারন মানুষ অর্ধাহারে, অনাহারে মারা পড়ছে। সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে শ্রেফ চোখ বন্ধ করে বসে আছে।’ কথাগুলো বলেই অপ্রস্তুত ভাবে একটু হেসে সামনের পা-দুটো ইতস্তত ঘষতে থাকে সে। এবার পেছনের পা দুটো সটান করে বুকডন সেরে নিল বেড়ালটি। আমি এই ভরদুপুরে অসহায় হয়ে দেখতে থাকলাম বেড়ালটির কান্ডকীর্তি । বেড়ালটি এবার সবুজ মোড়া থেকে নেমে এসে আমার সামনে এগিয়ে এল। ‘সেকি! কামড়ে টামড়ে দেবে নাকি! আমি খানিকটা ভয়ও পেতে শুরু করলাম। মনে মনে লাঠি জাতীয় কিছু একটা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু হাতের কাছে কিছুই না পেয়ে তাকিয়েই রইলাম। হাতে শুধু নাজিম হিকমতের ছোট্ট কবিতার পাতলা বই। দেখি না কি করে ! কিন্তু না, বিড়ালটি কিছুই করল না। বরং শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আমার দিকে। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমি জানি আপনি লাঠি খুঁজছেন, আমাকে তাড়াতে। তাই না। আমাকে তাড়াতে হবে না। আমিই চলে যাব। তবে যাবার আগে বলে যাই, আমি মানবেড়াল- মানুষের মুখ ও মনের কথা পড়তে পারি। এ কথা শুনে আমি তো থ বনে গেলাম। সেদিকে ভ্রæক্ষেপ না করে ঠান্ডা মাথায় বেড়ালটি বলতে লাগল, আমি কিছুকাল এক মাষ্টার মোশয়ের বাড়িতে বেশ সুখেই দিন কাটিয়েছিলাম। সেখানে অনেক ইতিহাস-কাহিনী শুনতাম। আপনারা মানুষেরা ধর্মের নামে, জাতপাতের নামে, দেশের নামে কোটি কোটি জাতভাইদের খুন করেছেন । আমি প্রতিবাদ করলাম, শুধু মারাটাই ইতিহাস নয়। বাঁচানোটাও দেখতে হবে । নাইলে সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতি কিভাবে গড়ে উঠল। বিড়ালটি কটাক্ষের ¯^রে বলল, তা ঠিকই, তবে এ গ্রহটিকে নিজেরা জবরদখল করে ! পরক্ষনেই বলল, আচ্ছা বলুনতো পৃথিবীটা কি আপনাদের অর্থাৎ মানুষদের একার! বাকী ১৫ লক্ষ প্রজাতিকে খাদ্য আর দাস বানিয়ে রেখে মানবিক সভ্যতা সাজাচ্ছেন!! ঐক্যের বদলে ভেদাভেদ আর যুদ্ধ, কল্যানের বদলে মারনাস্ত্র, রক্ষার বদলে মায়াকান্না! এসব ছেলেমানুষী আপনারা করেন কেন। এ্যাঁ।’ আমি খানিক চুপ থেকে বললাম, মানব সভ্যতা উন্নত বলেই পশুরক্ষারও নানারকম আইন হয়েছে। বেড়ালটি আমাকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে আবার বলতে শুরু করল, আপনাদের মানুষদের মনুষ্যত্ব যেমনি হাস্যকর তেমনি পশুপ্রেম আরও বেশী হাস্যকর। যে পশু বা পাখিটিকে একটু পর সে হত্যা করে খাবে তার প্রতি কি অসীম মায়া! খড়কুটো, ভূষি খাইয়ে, যতœ-আত্মি করে কিছুদিন জিইয়ে রাখলে মায়া আরো বেড়ে যায়। পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়¯^জন বেড়াতে এলে তাদের মেহমানদারীতে প্রানপ্রিয় পশু বা পাখিটির বলি চড়ানো হবে। অন্যদিকে চলে “ বাঘ রক্ষা আন্দোলন”। আহ! এই মানুষেরা সে যুগে থাকলে হয়ত “ডায়নোসোর রক্ষা আন্দোলন” করতো। কুকুর-বিড়ালসহ স্তন্যপায়ী কিংবা সরীসৃপ জাতীয় প্রানী পর্যন্ত মানুষের হাত থেকে নিস্তার পায় না! ” এই ভর দুপুরে মানবজাতির এহেন অপমান কাহাতক সহ্য করা যায়! আমি প্রতিবাদে মানব সভ্যতার শিল্প-সাহিত্য-সিনেমার কথা তুলে ধরা শুরু করলে আমাকে অবাক করে দিয়ে সেও যোগ দিলো আমার সংগে। আর তখন বারান্দার পোষা টিয়া পাখিটি আমাদের কথোপকোথনের দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করছে- কি হচ্ছে এখানে। বিড়ালটি যে চার্লি চ্যাপলিনের ডগস লাইফ সিনেমাটি মনিবের বাসায় দেখেছে, তা জানিয়ে বলল, ভাবলাম, যাক মানুষ তাহলে আমাদের বিড়ালদের নিয়েও ছবি করার কথা ভাবছে। তারপর যখন বিড়াল রাজ্যের গল্প শুনলাম, তখন উৎসাহ উদ্দীপনা আরো বেড়ে গেলো। তাইতো এত চেষ্টা তদবির করে এখানে আসা। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম কিসের কি! লেখকের এমন বেবহার(ব্যবহার)! সব দেখি বিখ্যাত হবার ঝোঁক। ” এরপর বেড়ালটি নিজে নিজেই বলল, মানুষ কি আর বেড়াল রাজ্যের কথা ভাববে!! বিড়ালদেরই ভাবতে হবে। যাই, কিছু একটা করতে হবে।” বলেই আর মুহূর্তকাল দেরী না করে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল বেড়ালটি। পরে বারান্দার গ্রিল দিয়ে লাফ দিয়ে কোথায় উধাও হয়ে গেল। আমি থ হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার প্রস্থানের দিকে। চেয়ে দেখি টিয়া পাখিটাও সেদিকে তাকিয়ে। কতক্ষন জানি না। সম্বিৎ ফিরে পেতেই দেখি বেয়ারা ঝন্টু চেয়ারের পেছনে চায়ের কাপ ধরে দাঁড়িছে আছে। সে বলল, মাঝে আরেকবার এসেছিলাম। স্যার ঘুমিয়ে পড়েছেন দেখে আর ডির্ষ্টাব করিনি। ‘কি! আমি ঘুমুচ্ছিলাম!! ’, আমি অবাক হয়ে চায়ের পেয়ালাটা নিয়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবলাম,তাহলে, এতক্ষন কি তাহলে ¯^প্ন দেখলামা! কিন্তু ঝন্টুকে এ বিষয়ে আর কিইবা বলা যায়। বাকী রইল ঐ টিয়া পাখি! টিয়া আর আমি একে অন্যের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম। জিজ্ঞেস করতে হোলনা। ঝন্টু নিজেই বললো, স্যার বারান্দার গ্রিল দিয়ে একটি অদ্ভুত রংয়ের বিড়ালকে লাফিয়ে যেতে দেখলাম। যাই রংচিকে গিয়ে বলে আসি আবার খাবার-টাবারে মুখ দিল কিনা কে জানে! তাহলে তো আরেক কেলেংকারি! বলতে বলতে ঝন্টু বেরিয়ে গেল। আমি কি বলব খুঁজে না পেয়ে চোখ ছানাবড়া করে দ্রুত চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকলাম!! এই ঘটনা কি পৃথিবীর কাউকে বলা যায়?? ---- বিধু ভূষন নাথ পলাশ ( লেখক আইনজীবি , চাঁদপুর জেলা জজ কোর্ট)
← Back to All Articles
Click to Chat